-আর কে নিরব
ট্টান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবির) সনাক ইয়েস জাতীয় সম্মেলন মানেই ইয়েস সদস্যদের কাছে জাতীয় একটি উৎসব। সমগ্র বাংলাদেশ থেকে ইয়েস, স্বজন ও সনাক সদস্যরা ছুঁটে আসে সম্মেলন কেন্দ্রে এক অদৃশ্য ভালবাসার টানে। সম্মেলনে যাওয়ায় সুযোগ পাওয়াটা খুবই ভাগ্যের ব্যাপার। পাঠক বন্ধুরা এই লেখাটি লেখার আগে আপনাদের টিআইবি সর্ম্পকে মোটামুটি ধারণা দিতে চাই। কারণ আমার এই লেখা পড়ে আপনাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে টিআইবি, সনাক,ইয়েস এসব আবার কী? প্রিয় পাঠক টিআইবি একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ,দলীয় রাজনীতি মুক্ত ও অলাভজনক দূর্নীতি বিরোধী সামাজিক চাহিদা বৃদ্ধির বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। টিআইবি এমন এক বাংলাদেশ দেখতে চায় যেখানে সরকার, রাজনীতি, ব্যবসায় বাণিজ্য নাগরিক সমাজ ও সাধারণ মানুষের জীবন হবে দূনীর্তিমুক্ত। টিআইবির সহযোগী হিসেবে দেশের স্থানীয় পর্যায়ে সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) ও ইয়ুথ এনগেজম্যান্ট এ্যান্ড সার্পোট (ইয়েস) সক্রিয় ভাবে দূর্নীতিবিরোধী সামাজিক কাজ করে যাচ্ছে। কুমিল¬ায় টিআইবির যাত্রা শুরু করে ২০০৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর । আর আমি টিআইবির সাথে সম্পৃক্ত হই ২০১৫ সালের মে মাসে। আমার জানামতে, ২০১২ সালে টিআইবি সর্বশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তখন আমি টিআইবির সদস্য ছিলাম না তাই সম্মেলনে যাওয়ার সুযোগ হইনি। কিন্তু এবার বিগত কার্যক্রমগুলোতে সক্রিয় ভাবে কাজ করায় যাওয়ার সুযোগ পাওয়ায় আর মিস করিনি। কুমিল¬ার ইয়েস ফ্রেন্ডদের মধ্যে সম্মেলনে যাওয়ার জন্য সক্রিয় কার্যক্রমের উপর ভিত্তি করে সর্বমোট ৩৫ জন ইয়েস এবং ইয়েস ফ্রেন্ডসকে নিবার্চিত করা হয়েছে। ৩৫ জনের মধ্যে আমি একজন হতে পেরে খুবই ভাল লাগছিল। আমাদের এবারের সম্মেলনের স্থান হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল ঢাকা বঙ্গবন্ধু আর্ন্তজাতিক সম্মেলন কেন্দ্র। টিআইবি কুমিল¬া অফিসের এরিয়া ম্যানেজার আশরাফ মাহমুদ মুঠোফোনে বার্তার মাধ্যমে জানিয়ে দিলেন সম্মেলনে যোগ দিতে আমরা ঢাকা যাচ্ছি ৩ ফেব্র“য়ারী সকাল ১০টায়। যাত্রা শুরু হবে ঝাউতলাস্থ কুমিল¬া টিআইবি অফিস থেকে। অবশ্য এর জন্য গত এক মাস আগ থেকে আমাদের জোর প্রস্তুতি চলছিল। কুমিল¬া সনাকের সভাপতি প্রিয় আলী আকবর মাসুম, সদ্য বিদায়ী সভাপতি শাহ মো: আলমগীর খান, সদস্য বদরুল হুদা জেনু আর জমির উদ্দিন খান জম্পি সার্বক্ষনিক পাশে থেকে আমাদের অনুপ্রাণিত করে যাচ্ছিলেন। অবশেষে সেই কাঙ্খিত দিনটি এলো। আমি আর আমার আরেক ইয়েস সদস্য এম বিল¬াল নির্ধারিত সময় সকাল ১০টায় টিআইবির অফিসে উপস্থিত হলাম। অফিসে প্রবেশের পরে একে একে সব ইয়েস বন্ধুদের সাথে দেখা হলো। সবাই যার যার পছন্দের জামা আর নিজেদের প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে। সবাইকে দেখতে খুব সুন্দর লাগছিল। সবার হাঁসিমাখা মুখ গুলো দেখে এক মূহূর্তেই মনটা ভালো হয়ে গেল। টিআইবি অফিস ত্যাগ করার আগে আমাদের সার্র্বিক বিষয়ে প্রয়োজনীয় পর্রামশ দিলেন সনাকের সদস্য বদরুল হুদা জেনু। ঠিক ১১ টায় শাসনগাছা বাস স্টেশন থেকে “এশিয়া এয়ারকন” বাসে করে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম আমরা। বাসে সবাই সবার আসন বুঝে নিলাম। বাস চলছে ঢাকার পথে। কিছুদূর যাওয়ার পরেই হালিম ভাই ( সাবেক ইয়েস নাট্যদলের সদস্য) ওঠে এসে সবার উদ্দেশ্যে বললেন-“ সবাই কি ঢাকায় পান্তাভাতে যাইবা? গান-টান হবে না?” আমরা সবাই এক সাথে চিৎকার করে বললাম-হবে। গান ধরলো নকিব-“ মনের সুখ নাইরে সুখ পরানের পাখি, ১০-১২ টা বিয়া কইরা জেলায় জেলায় ঘুরি। মনের সুখ নাই রে...” আমরা সবাই নকিবের সাথে সুর মেলালাম। তারপর একে একে সবাই গান গাইলাম,হালিম ভাই ও সাখাওয়াতের কৌতুকে জমে ওঠলো আমাদের আসর। গান গাইতে গাইতে কখন যে ঢাকায় পৌছে গেলাম টেরই পাইনি। বাস ড্রাইভার আমাদের যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের কাছে নামিয়ে দিলেন। সেখান থেকে কিছুটা পথ হেটে আমরা আবার বাসে উঠলাম। উদ্দেশ্য মিরপুর সাড়ে ১১। ঠিক ৩টা ৩০ মিনিটে আমরা মিরপুর সাড়ে এগারো পল¬বীতে পৌছালাম। দুপুরের খাবার হলো “ ফুলকুচি ক্যাফে সপ এন্ড পার্টি সেন্টারে”। খাওয়া শেষে আমরা ওঠলাম নির্ধারিত “দিশা একাডেমিতে” দিশা হচ্ছে একটি এনজিও প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়। সেখানে আমাদের থাকা খাওয়ার চমৎকার ব্যবস্থা করা হলো। আমাদের ৩/৪ জনের গ্র“প করে রুম ভাগ করে দিলেন এসি. ম্যানেজার মাইনুল ভাই। আমি কক্ষসঙ্গী পেলাম রবি,নকিব ও শুভ ভাইকে। অত্যন্ত চমৎকার পরিপাটি একটি রুমে ওঠলাম আমরা। এখানে আমাদের ২ রাত থাকতে হবে। সুন্দর একটি থাকার ব্যবস্থা দেখে এক মূহূর্তেই সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেল। আমার কক্ষসঙ্গী সবাই কার বিছানা কোনটা হবে এনিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু করলেন। আমি জানালার পাশের বিছানাটি বেছে নিলাম। জানালায় রাতের ব্যস্ত ঢাকা শহর আর খোলা আকাশ দেখার খুব শখ আমার। কাধেঁর ব্যাগটা এক ঝাটকায় ফেলে নরম বিছানায় পিঠ লাগালাম। আহ! কি শান্তি। রাতের খাবারের ব্যবস্থা এখানেই করা হল। একজন এসে জানিয়ে দিলেন রাত সাড়ে ৮ টায় আমাদের খাবার টেবিলে দেওয়া হবে। আমরা সবাই যথাসময়ে রাতের খাবার সারলাম। এখানকার খাবারের মানও খুব সুন্দর ও সুস্বাদু। তৃপ্তি সহকারে খেলাম সবাই। খাবারের পর টিআইবি কুমিল¬া অফিসের এসি.ম্যানেজার মাইনুল ভাই সম্মেলনের আগামীদিনের কর্মসূচি সকল বিষয় নিয়ে ধারণা দিলেন। সেখানে সবাই মিলে আগামীদিনের কর্মসূচির পরিকল্পনা করে নিলাম। তারপর সবাই চলে গেলাম সাবেক ইয়েস দলনেতা সাকিব ভাইয়ের রুমে। সেখানে ঘন্টা দুয়েক চলল ইয়েস দলনেতা এবায়েদ এর পরিচালনায় কুমিল¬া ইয়েস বন্ধুদের নিয়ে ‘ভঁহহু মধসধং’।
রিয়াদ, সাকিব আর রিমন ভাইয়ের অসাধারণ পারফমেন্সে বিনদাস মাস্তি করলাম আমরা। পরদিন ৪ ফেব্র“য়ারী সকাল সকাল সম্মেলন কক্ষে পৌছাতে হবে তাই সবাই ঘুমিয়ে পড়লাম। ফজরের আগেই অভি ভাইয়ের মোবাইলের এ্যালার্মে আমার ঘুম ভাঙ্গলো। যদিও অভি ভাই তখনো নাক ডেকে গভীর ঘুমে ঘুমাচ্ছিলেন। আমি সবাইকে ডেকে তুললাম। সাড়ে ৬ টায় নাস্তা সেরে ভেন্যুতে যাওয়ার বাস ধরলাম আমরা। বাসে আমাদের সাথে যোগ হল নীলফামারীর ইয়েস বন্ধুরা। সকাল ৭ টা ৫০ মিনিটের মধ্যে আমরা পৌছে গেলাম বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে। কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আমরা সেখানে প্রবেশের অনুমতি পেলাম। প্রথমেই ৬ নং বুথে রেজি:এর কাজটা সারলাম সবাই। রেজিস্ট্রেশনের সময় আমাদের সবাইকে টিআইবির পক্ষ থেকে একটি সুন্দর ব্যাগ উপহার দিলো। যার মধ্যে নোট বুক,কলম,খাবারের টোকেন সহ পোগ্রাম সূচি ছিল।
তা নিয়ে আমরা ভিতরে প্রবেশ করলাম। সবাই বসলাম উপরের গ্যালারির মধ্যের সারিতে একেবারে মঞ্চ বরাবর। উপর থেকে ভালোভাবে অনুষ্ঠান উপভোগ করা যায়। আয়োজক কমিটি থেকে জানতে পারলাম-সমগ্র বাংলাদেশ থেকে ৪৫টি সনাক থেকে প্রায় ২৭ শত সদস্য অংশগ্রহন করেছে এবারের সম্মেলনে। এর মধ্যে ইয়েস বন্ধুদের সংখ্যাই বেশি। হাজার হাজার ইয়েস বন্ধুদের বর্ণিল সাজ দেখে ঈদের আমেজ বিরাজ করছিল আমাদের মনে। কোন কোন ইয়েস বন্ধুরা একই ধরনের জামা পরে এসেছিল। তা দেখে মনে হচ্ছিল এ যেন ইয়েস,ইয়েস ফ্রেন্ডস, স্বজন আর সনাকদের মিলনমেলা। নির্ধারিত সময়ে ঘড়ির কাটায় মিল রেখে জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে আমাদের অনুষ্ঠান শুরু হল। পুরো উপস্থিতি সবাই বুকে হাত রেখে একসাথে গলা ছেড়ে জাতীয় সংগীত গাইলাম। খুব ভাল লাগছিল তখন। তারপরই শুরু হল ইয়েস মেম্বারদের অংশগ্রহনের টিআইবি থিম সংগীতের সাথে কোরিওগ্রাফি। গানটি দারুনভাবে উপভোগ করলাম সবাই। এরপরেই স্বাগত বক্তব্য নিয়ে আসলেন ইয়েসদের প্রিয় টিআইবির প্রধান নিবার্হী পরিচালক ইখতেখারুজ্জামান। সবাই তাঁর বক্তব্য খুব মনোযোগ সহকারে শুনলাম। দূর্নীতি বিরোধী শপথ পাঠের মধ্য দিয়ে সম্মেলনের উদ্বোধন ঘোষনা করেন টিআইবি স্ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপার্সন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল। এরপর প্যানেল আলোচনায় আমরা পেলাম টিআইবি ট্রাস্টি বোর্ডের মহাসচিব সেলিনা হোসেনকে। মুক্ত আলোচনায় ও ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে সূচনা পর্বের সমাপ্তি ঘটে। র্কম অধিবেশনে বাংলাদেশে দূর্নীতিবিরোধী সামাজিক আন্দোলন: ‘আমার নতুন ভাবনা’ পাশাপাশি একই সময়ে চলমান কর্মকান্ডের মধ্যে ছিল সনাকের ক্লাস্টার ভিত্তিক ১১টি এবং ঢাকা ইয়েস গ্র“প ভিত্তিক একটি স্টলের কার্টুন ও ফটোগ্রাফি প্রর্দশন।
যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলের ঐহিত্য ও সাংস্কৃতিতে তুলে ধরা হয়েছে। আমাদের প্রর্দশনীর নাম ছিল গোমতী। এতে কুমিল¬ার বিভিন্ন ঐতিহ্যকে সুন্দরভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি আমরা। কর্ম অধিবেশন শেষ হলে ঠিক ১টা ৩০ এ আমাদের দুপুরের খাবারের বিরতি দেওয়া হয়। এই ফাঁকে আমি আর সাখাওয়াত চলে গেলাম নতুন বন্ধুদের খুঁেজ। খুলনা দিনাজপুর রাজশাহী সিলেট আর চট্টগ্রাম ইয়েস বন্ধুদের সাথে দারুন ভাব জমালাম আমরা। তাদের সাথে প্রযুক্তির অসাধারণ সুযোগ সেলফি ও তোলা হলো অনেক। ইতিমধ্যেই কুমিল¬ার ইয়েস সদস্য রনি ভাই দিনাজপুর বন্ধুদের নিয়ে নাচ শুরু করে দিলেন আনন্দে। তাদের সাথে আমরাও যোগ দিলাম। আমি খুব অবাক হচ্ছিলাম জাদুঘরের জাদুর পরশে আমরা একদিনের পরিচয়ে একে অপরের এতটাই কাছাকাছি আসছিলা যে মূর্হূতের মধ্যেই আমরা সবার বন্ধু হয়ে গেলাম। খুব ভালো বন্ধু। এ সময় কেউ একজন এসে নাচ বন্ধ করে দিলেন। তাই নাচ বন্ধ করে আমরা খাবার খেতে গেলাম।
আমরা খেলাম দুতলার সেলিব্রেটি হলরুমে। খাবারের মান অনেক ভালো। খাবার খেতে খেতে নতুন বন্ধুত্ব ও কম হয়নি। রাঙ্গামাটি,বি-বাড়িয়া, মাগুরা,পিরোজপুর,চাঁদপুরের বন্ধুদের সাথে দেখা হলো। কথার ফাঁকে সেলফিও তোলা হয়ে গেল। কাচ্চি বিরানী ,মুরগের রোস্ট,র্জদা আর বিভিন্ন ধরনের সালাত দিয়ে খুব আয়েশ করে খেলাম আমরা। সর্ম্পূণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সম্মেলন কক্ষটি সব কিছুই অসাধারণ। পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি ঘুরে ঘুরে দেখলাম সবকিছু। বিরতির পর শুরু হলো উদ্বুদ্ধকরণ অধিবেশন। আলোচক হিসেবে আমরা পেলাম ৩০ তম বিসিএস এ প্রথম স্থান অধিকারী ও সরকারের ভ্যাট ও কাস্টমস সহকারী সুশান্ত পাল, এভারেস্ট বিজয়ী নিশাত মজুমদার আর উদ্যোক্তা সামিরা জুবেরী হিমিকাকে। একেক জনের বক্তব্যে আমরা অনেক বেশি অনুপ্রাণিত হচ্ছিলাম। সত্যি অসাধারণ কিছু কথা জানলাম। নিশাত মজুমদার এমন ভাবে বক্তব্য দিচ্ছিলেন যেন আমরাও তার সাথে এভারেস্ট জয় করছি। সুশান্ত পাল ও আমাদের চোখে স্বপ্ন বুনে দিলেন। এরপর শিক্ষার্থীদের মধ্যে দূর্নীতি বিরোধী রচনা প্রতিযোগিতার পুরষ্কার বিতরনীর পর ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে সম্মেলন ঘোষনা করলেন টিআইবির নিবার্হী পরিচালক ইখতেখারুজ্জামান। এরপর চা বিরতি। নেটওর্য়াকিং এরপর সন্ধায় আয়োজন করা হলো জমকালো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। এতে মূল আর্কষণ ছিল শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন ও ব্রেন্ড সংগীতের দল জলের গান। সম্মেলনের পুরো সময়টুকু ই ছিল স্বপ্নের মত। এর পর দিন সকালে আমরা কুমিল¬ায় ফিরে আসি।
রিয়াদ, সাকিব আর রিমন ভাইয়ের অসাধারণ পারফমেন্সে বিনদাস মাস্তি করলাম আমরা। পরদিন ৪ ফেব্র“য়ারী সকাল সকাল সম্মেলন কক্ষে পৌছাতে হবে তাই সবাই ঘুমিয়ে পড়লাম। ফজরের আগেই অভি ভাইয়ের মোবাইলের এ্যালার্মে আমার ঘুম ভাঙ্গলো। যদিও অভি ভাই তখনো নাক ডেকে গভীর ঘুমে ঘুমাচ্ছিলেন। আমি সবাইকে ডেকে তুললাম। সাড়ে ৬ টায় নাস্তা সেরে ভেন্যুতে যাওয়ার বাস ধরলাম আমরা। বাসে আমাদের সাথে যোগ হল নীলফামারীর ইয়েস বন্ধুরা। সকাল ৭ টা ৫০ মিনিটের মধ্যে আমরা পৌছে গেলাম বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে। কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আমরা সেখানে প্রবেশের অনুমতি পেলাম। প্রথমেই ৬ নং বুথে রেজি:এর কাজটা সারলাম সবাই। রেজিস্ট্রেশনের সময় আমাদের সবাইকে টিআইবির পক্ষ থেকে একটি সুন্দর ব্যাগ উপহার দিলো। যার মধ্যে নোট বুক,কলম,খাবারের টোকেন সহ পোগ্রাম সূচি ছিল।
তা নিয়ে আমরা ভিতরে প্রবেশ করলাম। সবাই বসলাম উপরের গ্যালারির মধ্যের সারিতে একেবারে মঞ্চ বরাবর। উপর থেকে ভালোভাবে অনুষ্ঠান উপভোগ করা যায়। আয়োজক কমিটি থেকে জানতে পারলাম-সমগ্র বাংলাদেশ থেকে ৪৫টি সনাক থেকে প্রায় ২৭ শত সদস্য অংশগ্রহন করেছে এবারের সম্মেলনে। এর মধ্যে ইয়েস বন্ধুদের সংখ্যাই বেশি। হাজার হাজার ইয়েস বন্ধুদের বর্ণিল সাজ দেখে ঈদের আমেজ বিরাজ করছিল আমাদের মনে। কোন কোন ইয়েস বন্ধুরা একই ধরনের জামা পরে এসেছিল। তা দেখে মনে হচ্ছিল এ যেন ইয়েস,ইয়েস ফ্রেন্ডস, স্বজন আর সনাকদের মিলনমেলা। নির্ধারিত সময়ে ঘড়ির কাটায় মিল রেখে জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে আমাদের অনুষ্ঠান শুরু হল। পুরো উপস্থিতি সবাই বুকে হাত রেখে একসাথে গলা ছেড়ে জাতীয় সংগীত গাইলাম। খুব ভাল লাগছিল তখন। তারপরই শুরু হল ইয়েস মেম্বারদের অংশগ্রহনের টিআইবি থিম সংগীতের সাথে কোরিওগ্রাফি। গানটি দারুনভাবে উপভোগ করলাম সবাই। এরপরেই স্বাগত বক্তব্য নিয়ে আসলেন ইয়েসদের প্রিয় টিআইবির প্রধান নিবার্হী পরিচালক ইখতেখারুজ্জামান। সবাই তাঁর বক্তব্য খুব মনোযোগ সহকারে শুনলাম। দূর্নীতি বিরোধী শপথ পাঠের মধ্য দিয়ে সম্মেলনের উদ্বোধন ঘোষনা করেন টিআইবি স্ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপার্সন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল। এরপর প্যানেল আলোচনায় আমরা পেলাম টিআইবি ট্রাস্টি বোর্ডের মহাসচিব সেলিনা হোসেনকে। মুক্ত আলোচনায় ও ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে সূচনা পর্বের সমাপ্তি ঘটে। র্কম অধিবেশনে বাংলাদেশে দূর্নীতিবিরোধী সামাজিক আন্দোলন: ‘আমার নতুন ভাবনা’ পাশাপাশি একই সময়ে চলমান কর্মকান্ডের মধ্যে ছিল সনাকের ক্লাস্টার ভিত্তিক ১১টি এবং ঢাকা ইয়েস গ্র“প ভিত্তিক একটি স্টলের কার্টুন ও ফটোগ্রাফি প্রর্দশন।
যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলের ঐহিত্য ও সাংস্কৃতিতে তুলে ধরা হয়েছে। আমাদের প্রর্দশনীর নাম ছিল গোমতী। এতে কুমিল¬ার বিভিন্ন ঐতিহ্যকে সুন্দরভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি আমরা। কর্ম অধিবেশন শেষ হলে ঠিক ১টা ৩০ এ আমাদের দুপুরের খাবারের বিরতি দেওয়া হয়। এই ফাঁকে আমি আর সাখাওয়াত চলে গেলাম নতুন বন্ধুদের খুঁেজ। খুলনা দিনাজপুর রাজশাহী সিলেট আর চট্টগ্রাম ইয়েস বন্ধুদের সাথে দারুন ভাব জমালাম আমরা। তাদের সাথে প্রযুক্তির অসাধারণ সুযোগ সেলফি ও তোলা হলো অনেক। ইতিমধ্যেই কুমিল¬ার ইয়েস সদস্য রনি ভাই দিনাজপুর বন্ধুদের নিয়ে নাচ শুরু করে দিলেন আনন্দে। তাদের সাথে আমরাও যোগ দিলাম। আমি খুব অবাক হচ্ছিলাম জাদুঘরের জাদুর পরশে আমরা একদিনের পরিচয়ে একে অপরের এতটাই কাছাকাছি আসছিলা যে মূর্হূতের মধ্যেই আমরা সবার বন্ধু হয়ে গেলাম। খুব ভালো বন্ধু। এ সময় কেউ একজন এসে নাচ বন্ধ করে দিলেন। তাই নাচ বন্ধ করে আমরা খাবার খেতে গেলাম।
আমরা খেলাম দুতলার সেলিব্রেটি হলরুমে। খাবারের মান অনেক ভালো। খাবার খেতে খেতে নতুন বন্ধুত্ব ও কম হয়নি। রাঙ্গামাটি,বি-বাড়িয়া, মাগুরা,পিরোজপুর,চাঁদপুরের বন্ধুদের সাথে দেখা হলো। কথার ফাঁকে সেলফিও তোলা হয়ে গেল। কাচ্চি বিরানী ,মুরগের রোস্ট,র্জদা আর বিভিন্ন ধরনের সালাত দিয়ে খুব আয়েশ করে খেলাম আমরা। সর্ম্পূণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সম্মেলন কক্ষটি সব কিছুই অসাধারণ। পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি ঘুরে ঘুরে দেখলাম সবকিছু। বিরতির পর শুরু হলো উদ্বুদ্ধকরণ অধিবেশন। আলোচক হিসেবে আমরা পেলাম ৩০ তম বিসিএস এ প্রথম স্থান অধিকারী ও সরকারের ভ্যাট ও কাস্টমস সহকারী সুশান্ত পাল, এভারেস্ট বিজয়ী নিশাত মজুমদার আর উদ্যোক্তা সামিরা জুবেরী হিমিকাকে। একেক জনের বক্তব্যে আমরা অনেক বেশি অনুপ্রাণিত হচ্ছিলাম। সত্যি অসাধারণ কিছু কথা জানলাম। নিশাত মজুমদার এমন ভাবে বক্তব্য দিচ্ছিলেন যেন আমরাও তার সাথে এভারেস্ট জয় করছি। সুশান্ত পাল ও আমাদের চোখে স্বপ্ন বুনে দিলেন। এরপর শিক্ষার্থীদের মধ্যে দূর্নীতি বিরোধী রচনা প্রতিযোগিতার পুরষ্কার বিতরনীর পর ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে সম্মেলন ঘোষনা করলেন টিআইবির নিবার্হী পরিচালক ইখতেখারুজ্জামান। এরপর চা বিরতি। নেটওর্য়াকিং এরপর সন্ধায় আয়োজন করা হলো জমকালো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। এতে মূল আর্কষণ ছিল শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন ও ব্রেন্ড সংগীতের দল জলের গান। সম্মেলনের পুরো সময়টুকু ই ছিল স্বপ্নের মত। এর পর দিন সকালে আমরা কুমিল¬ায় ফিরে আসি।


0 মন্তব্য(গুলি) :
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন