Ads
News
Loading...

বাংলাদেশ বেতার কুমিল¬া কেন্দ্রের মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক ‘‘অহংকারে চির জাগ্রত’ অনুষ্ঠানে বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ আব্দুর রউফ এর সাক্ষাৎকার

বিজয়ের পতাকা নিয়ে দৃপ্ত পায়ে চলবে স্বদেশ। প্রগতির পথে। প্রিয় শ্রোতা বাংলাদেশ বেতার কুমিল¬া কেন্দ্রের মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক অনুষ্ঠান অহংকারে চিরজাগ্রত থেকে আমি শাহজাহান চৌধুরী আপনাদের জানাচ্ছি প্রীতি ও শুভেচ্ছা। মার্চ মাস। এ মাসটি আমাদের বাঙালির জন্য গৌরব ও গৌরবের মাস। এ মাসের ১৭ তারিখ টুঙ্গিপাড়া নামক এক অজ পাড়াগায়ে জন্মেছিলেন এক মহানায়ক। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু মেখ মুজিবুর রহমান। তার ৭ই মার্চের ভাষণ এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। এই অমোঘ বানীতে ২৫শে মার্চ শুরু হয়েছিল বাঙালীর মুক্তির যুদ্ধ। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ আব্দুর রউফ আজ আমাদের এই অনুষ্ঠানের অতিথি। জনাব আব্দুর রউফ এর জন্ম ঊনিশ শো ছিচলি¬শ সালে চকবাজার এলাকায়। বাবা ইয়াকুব আলী, মা জোবেদা খাতুন। তিনি ঊনিশশো আটষট্টি সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে এম.এ পাশ করেন। জনাব রউফ ১৯৬০ সালে কুমিল¬া জিলা স্কুলে পড়াশুনা করাকালীন ছাত্রলীগের মাধ্যমে রাজনীতিতে আসেন। ১৯৬২-৬৩ তে ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক। ১৯৬৪ তে কুমিল¬া ভিক্টোরিয়া কলেজের ভিপি, ১৯৬৫ থেকে ৬৭ পর্যন্ত জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি, ১৯৬৮ তে তৎকালীন ইকবাল হল, বর্তমান সার্জেন্ট জহিরুল হক হল ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন কুমিল¬া শহর আওয়ামীলীগের সভাপতি। মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক অধ্যক্ষ আব্দুর রউফ ১৯৭৭ সাল থেকে  অজিতগুহ কলেজের অধ্যক্ষ হিসাবে যোগ দিয়ে সম্প্রতি অবসরে যান। ২নং সেক্টরের একটি ক্যাম্প চিফ মটিভেটর জনাব আব্দুর রউফ বর্তমানে কুমিল¬া আদর্শ সদর উপজেলার চেয়ারম্যান। শ্রোতা বন্ধুরা, আমরা এখন তার কাছে তার যুদ্ধদিনের কথা শুনব। আচ্ছা রউফ ভাই, আপনি এই সোজা যে আপনি একজন ক্যাম্প চীফ এবং পলিটিকেল মটিভেটর। কিভাবে মুক্তিযুদ্ধটাকে আপনারা সংঘটিত করেছিলন?
আঃ রউফঃ ধন্যবাদ ভাই শাহজাহান, আমার যতদূর মনে পড়ে ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু জাতির জনক যখন রেইসকোর্স ময়দানে ভাষণ দিলেন সেইদিন থেকে আমাদের চোখে মুখে এবং কাজে আমরা যেন নতুন উৎসাহ উদ্দীপনার স্বপ্ন দেখতে লাগলাম। আমরা দিনের পরদিন মুক্তিযুদ্ধে সংগঠিত করতে লাগালাম। বাংলার মানুষদেরকে আমার কুমিল¬ায় যেখানেই সভা সমিতি হত, সেখানে গিয়ে আমরা আগামীদিনের যুদ্ধের পরিকল্পনা সম্পর্কে আমরা তাদেরকে রূপরেখা দিতাম। আমরা বলতাম ছয় দফার পরিবর্তে এক  দফার সংগ্রাম হবে। সেই সংগ্রাম হবে বাংলার স্বাধীনতার সংগ্রাম। সেটাকে লক্ষ্য করেই আমরা আবর্তিত হতেছিলাম। পরবর্তী সময়ে আমরা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়ে তুলি এবং সে স্বেচ্ছাসেবকদেরই মার্চপাস্ট আমরা করি কুমিল¬া শহরে। তেইশে মার্চ আমরা বিরাট মিছিল বের করেছিলাম, ২৪, ২৫ শের দিকে কাজী জহিরুল কাইয়ুম সাহেব প্রধান অতিথি হিসাবে আসলেন টাউন হলে সেখানে আমরা উপস্থিত হলাম। আমার বন্ধু মরহুম অধ্যক্ষ কালাম মজুমদার সেদিন স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর প্রধান ছিলেন।
শাঃ চৌঃ আইচ্ছা এই স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীদেরকে কারা ট্রেনিং দিত?
আঃ রউফঃ যারা ইউটিসিতে ছিলেন। সেই কর্মকর্তারা এবং যারা ইউটিসিতে প্রশিক্ষণ দিতেন তারাও সেদিন এই স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীদেরকে ট্রেনিং দিতেন। সেদিন আমার যতদূর মনে পড়ে কাজী জহিরুল কাইয়ুম সাহেব ফেলটু নিয়েছিলেন এবং সেলুট নেবার পর তিনি খোষণা করেছিলেন তোমাদের এই বাশের লাঠি একদিন অস্ত্র হবে। বাংলাদেশ স্বাধীন হবে।
শাঃ চৌঃ আচ্ছা রউফ ভাই, পচিশ তারিখ রাতের ব্যাপারটা আমাদের একটু বুঝিয়ে বলুন।
আঃ রউফঃ সেদিন থমথমে অবস্থা ছিল চতুর্দিকে। ............... চাঁদপুরের নেতা আওয়ামীলীগের নেতা মিজানুর রহমান চৌধুরী সাহেব এসেছিলেন কুমিল¬ায়। তার মাধ্যমে আমরা জানতে পারি যে, যেকোন সময়ে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। আমরা সেভাবেই প্রস্তুতি নিতেছিলাম। পঁচিশ তারিখ বিকাল বেলাতেই লোকজন আসতেছিল আমদের অফিসে। অফিস ছিল কলেজ রোডে। গোবিন্দবাবুর বাড়িতে। সেই বাড়িকে কেন্দ্র করে সেদিন কুমিল¬ায় প্রচুর লোক সমবেত হলেন। টুলের উপর দাঁড়িয়ে আমরা লোকজনদেরকে বলতেছিলাম, আপনারা প্রস্তুতি নিন, আজকেই হয়তো আমাদের উপরে আঘাত আসতে পারে।

শাঃ চৌঃ আচ্ছা রউফ ভাই, কখন আক্রান্ত হলেন আপনারা?
আঃ রউফঃ আমরা ২৫ তারিখ সন্ধ্যার পরেই লক্ষ্য করলাম। শহরটিতে যেন একটা ভুতুরে পরিবেশ এবং সেই পরিবেশকে লক্ষ্য করেই আমরা উপস্থিত হলাম টাউন হলে। টাউন হলে কুমিল¬া পাঠাগার থেকে দোতলায় একটি টেলিফোন ছিল। বঙ্গবন্ধুর বাড়ির সাথে আমরা যোগাযোগ করি। আমাদেরকে বলা হয়, আপনাদের প্রস্তুতি নিন। আজকে হয়তো আপনারা আক্রান্ত হবেন। সেই লক্ষ্যেই আমরা টাউন হল থেকে লক্ষ্য করলাম। আমাদের বীর সেনার, নাজমূল হাসান পাখি এবং রুস্তম আলীর নেতৃত্বে শহরে মিছিল শুরু হল।
শাঃ চৌঃ সেই রাতেই মিছিল?
আঃ রউফঃ সেই রাতেই মিছিল এবং মিছিলটি যখন টমছম ব্রীজ হয়ে যেতেছিল আমরাও তাদেরকে অনুসরণ করে বেরিয়ে আসলাম টাউন হল থেকে এবং সে পথে না গিয়ে আমরা আমাদের প্রফেসর খোরশেদ আলম সাহেবের বাড়ির দিকে অগ্রসর হলাম। ঝাউতলা পৌছা মাত্রই আমরা লক্ষ্য করলাম পুলিশ লাইন থেকে একটি গুলি এসে পড়ল আমাদের সামনে। আমরা আশ্রয় নিলাম গিয়ে প্রফেসর খোরশেদ আলম সাহেবের বাড়িতে।
শাঃ চৌঃ আচ্ছা রউফ ভাই, এরপরে আপনারা কিভাবে সংগঠিত হলেন? কোথায় হলেন?
আঃ রউফঃ মাঝখানে একদিন কারফিউ শিথিল করা হল। সেইদিন আমরা নদীর ঐ পাড়ে গেলাম এবং সেখান থেকে আমরা সীমান্তের ওপারে যাবার জন্য কোটেশ্বরে গিয়ে উপস্থিত হলাম এবং সেখানেই ক্যাপ্টেন রেজা, হাবিলদার একজন ছিলেন তার নামটা মুরাদ সাহেব। তিনিসহ আমরা প্রথম বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করি এবং একটি মূল গৃহের কক্ষ খুলে আমরা সেখানে অফিস বা দপ্তর প্রথম স্থাপন করি।
শাঃ চৌঃ তারপরে আপনারা কোথায় যোগাযোগ করলেন?
আঃ রউফঃ তারপরে সীমান্তের ওই পাড়ে মতিনগর আমরা গেলাম। সেখানে আমাদের চোখের চেহারা দেখে। চোখ মুখ দেখে তারা ভাবত পারল যে আমরা ক্ষুধার্ত। আমাদের খাওয়াবে, তারা বললেন, যে খাবারের জন্য আপনারা এসেছেন আপনারা মেহেরবাণী করে যদি আরো সামনে সোনামুড়া যান তাহলে আরো বিস্তারিত খবর পাবেন। সেই খবর আমরা পেলাম। আমরা নিশ্চিত হলাম সীমান্তের ওপাড়ে গেলে আমাদের অসুবিধা হবে না। সেখান থেকেই আমরা সীমান্তের ওপাড়ে যাই এবং সোনামুড়া থেকে প্রথম ক্যাম্প করে ............
শাঃ চৌঃ আচ্ছা, রউফ ভাই, আপনি তো একটি ক্যাম্প চিফ ছিলেন এবং পলিটিকেল মটিভেটর ছিলেন। এই ক্যাম্পের কিছু ঘটনা আমাদের বলবেন বা কিভাবে আপনারা সংগঠিত হলেন সেসব .....।
আঃ রউফঃ আমরা তখনই লক্ষ্য করেছি, বাংলাদেশে যারা বিডিআর, যারা ইপি আর ছিলেন।তারা আমাদের সাথে যোগাযোগ শুরু করলেন। পুলিশ বাহিনীর লোকেরা কিছু যোগাযোগ করলেন এবং কিছু আর্মির লোকেরাও যোগাযোগ করলেন। ছেলেমেয়েরা যারা সীমান্তের ঐ পাড়ে গেল তারাও আমাদের সাতে যোগাযোগ শুরু করল। সেখান থেকেই মুলত ক্যাম্প করার চিন্তা এবং প্রথম ক্যাম্পটি আমরা বক্সনগরেই করি। বক্স নগর থেকে পরবর্তীকালে বিভিন্ন ক্যাম্পের সৃষ্টি হয়।
শাঃ চৌঃ আচ্ছা, রফিক ভাই, এই যে এত যুদ্ধ করে ত্রিশ লক্ষ শহীদ হল, মা বোনের ইজ্জত গেল, এর বিনিময়ে আমাদের এই স্বাধীনতা কিন্তু যুদ্ধ অপরাধীদের তো বিচার হল না, এ ব্যাপারে আপনার কিছু বক্তব্য আমাদেরকে বলেন।
আঃ রউফঃ আমরা অবশ্যই বিশ্বাস করি তাদের বিচার হওয়া দরকার। কারণ যারা জীবনকে বাজী রেখে যারা যুদ্ধ করে ত্রিশ লক্ষ লোক আমাদের জীবন দিলেন, আমাদের দু লক্ষ মা বোন সতীত্ব হারালেন তাদের এই বিনিময়ে যারা রাজাকার আলবদর, আল সামস ছিলেন। যাদেরকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কোনদিন ক্ষমতা করার কথা বলেন নাই। তাদের বিচার অবশ্যই হতে হবে। এই বাংলার মাটিতে তাদের বিচার করার মধ্যে প্রকৃত অর্থে যে স্বাধীনতার যুদ্ধ আমাদের দেশে হয়েছিল। আমরা পাপমুক্ত হব এবং স্বাধীন বাংলাদেশের যে স্বপ্ন জাতির জনক দেখেছিলেন সেই রাষ্ট্রটি আমরা প্রতিস্থাপন করতে পারব।
শাঃ চৌঃ রউফ ভাই কুমিল¬া বেতার কেন্দ্রে আসার জন্য আপনাকে আমাদের আন্তরিক ধন্যবাদ। আগামী দিনে আমরা শ্রোতাবন্ধরা এভাবে আরেকজন বীরমুক্তিযোদ্ধাকে আমাদের এখানে অতিথি হিসাবে ডেকে আনব এবং আমরা মুক্তিযোদ্ধার মুখেই শুনব আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস। সবাইকে প্রীতি ও শুভেচ্ছা।
আঃ রউফঃ ধন্যবাদ ভাই শাহজাহান, আপনার মাধ্যমে কুমিল¬া বেতার কেন্দ্রে উপসিথত হয়ে শ্রোতাবন্ধুদেরকে আমার ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। আজকের এইদিন আমাদের একান্ত পবিত্রদিন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বাংলাদেশ মা ........ একটি অংশ বিশেষ। এই হিসাবে কুমিল¬া বেতার কেন্দ্রের এই ব্যবস্থার জন্য আমরা তাদেরকেও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি।

Share on Google Plus

About Unknown

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.

0 মন্তব্য(গুলি) :

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন